সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
আজ সোমবার | ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও আমাদের প্রস্তুতি

শুক্রবার, ০৯ জুলাই ২০২১ | ২:০২ অপরাহ্ণ | 112Views

জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও আমাদের প্রস্তুতি

বর্তমান সময়ের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়ের মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের উপর অনেক দেশের অস্থিত্ব নির্ভর করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মূলত মানব সৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক কারণে হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে মহাসাগরের পরিবর্তনশীল উত্তাপশক্তি, আগ্নেয়গিরির দূষণ, সূর্যের শক্তি উৎপাদন হ্রাস বা বৃদ্ধি পাওয়া, লানিনা ও এলনিনো ইত্যাদি। অন্যদিকে মানবসৃষ্ট কারনসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-জীবাশ্ন জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, অতিমাত্রার কালো ধোঁয়া, অবাদে কীটনাশক ও সারের ব্যবহার, কলকারখানা স্থাপন ও শিল্পায়নের জন্য বনাঞ্চল ধ্বংস করা, জৈবিক পচন, বায়ুমণ্ডলে নাইট্রাস-অক্সাইড, মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্যাসের পরিমান বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা আমাদের অগ্রগতিকে ক্রমাগত বাধাগ্রস্থ করছে।আমরা যদি স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত শুধু মাত্র ঘূর্ণিঝড়ের দিকটি বিবেচনা করি তাহলে দেখা যাবে এ সময়ে প্রায় ১২ টি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা ঘটেছে, আর ছোট বড় সকল দূর্যোগের সংখ্যা এই ৪৯ বছরে প্রায় ১৫৪ টি। নভেম্বর ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড় বরিশাল, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া জেলায় আঘাত হানে এবং ৫৭০৮ টি প্রাণের বিনিময়ে ক্ষান্ত হয়, ২৯ এপ্রিল তারিখ টি মনে পরলে অনেকের হয়তো মনের অজান্তেই চোখের পানি চলে আসে, এখনও মানুষ সেই ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ে কেপে উঠে, যেখানে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায় আর এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কারণে ক্ষতির শিকার হয়। ১৫ নভেম্বর ২০০৭, ঘূর্ণিঝড় সিডর আছড়ে পড়ে খুলনা ও বরিশালে সেইসাথে কেড়ে নিয়েছিল প্রায় ১০ হাজার প্রাণ, এরপর আইলা, মহাসেন,রোয়ানু, মোরা, ফণী, আম্পান ও ইয়াসের কারণে মোট ২৮২ টি প্রাণহানি হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিসূচক ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা, খরা ও পাহাড়ধসে, প্রতি বছর প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ‘ইউএন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন (ইউএনডিআরআর)’ এবং সেন্টার ফর রিসার্চ অন দ্য এপিডেমিওলজি অব ডিজাস্টারস (সিআরইডি) যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার মধ্যে বিগত ২০ বছরে (২০০০-২০১৯) দূর্যোগে্র কারণে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়, যেখানে সবার উপরে অবস্থান করছে চীন এবং বাংলাদেশের অবস্থান নবম, এছাড়াও এই দশ দেশের মধ্যে আঁটটি দেশ হলো এশিয়া মহাদেশের। সুতরাং এটা নিশ্চিত যে অন্য মহাদেশ তুলনায় এশিয়া মহাদেশের উপর জলবায়ু ঝুঁকি অনেক বেশি রয়েছে। এছাড়াও এতে বলা হয়েছে গত ২০ বছরে বাংলাদেশে ১১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিভিন্ন দূর্যোগের কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছে। এর একটি কারণ হচ্ছে ঘন ঘন বেড়ীবাঁধের ভাঙ্গন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় উপকূলের পাঁচ হাজার ৭৯৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধসহ মোট ১৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বাঁধ আছে যার একটা বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ এবং যথাসময়ে যথাযথ মেরামত করা হয়নি, যার ফলে প্রতিনিয়ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে নতুন নতুন এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর হাজার হাজার কৃষক ও উপকূলবাসীর তাদের সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। বৈশ্বিক আবহাওয়া বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের মতো ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্ব আসরে জলবায়ু ন্যায়বিচার দাবি করে আসছে কিন্তু যারা আমাদেরকে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হরহামেশা তালিম দেয় এই ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কতোখানি যুক্তিক এই প্রশ্ন থেকেই যায়। যে পরিমান তহবিল পাওায়ার অধিকার রাখে সে পরিমান তহবিল তো পাওয়া যায় না বরং যা পায় তার মধ্যেও থাকে অনেক ধরনের কঠিন শর্ত।
এ ক্ষেত্রে সস্থির কথা হল সময়ের সাথে সাথে আমাদের দক্ষতা বাড়ছে ও তুলনামূলকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমেছে। বর্তমান সরকার জলবায়ু মোকাবেলায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়ান্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (বিসিসিটি) গঠন করে এবং এতে নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি বিদেশী অনুদানও যুক্ত হচ্ছে। দূর্যোগ মোকাবেলায় আছে বিশাল দক্ষ জনবল যা ইয়াসের প্রস্তুতিতে আমরা দেখেছি স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউটস ও আনসার ভিডিপি মিলিয়ে প্রায় ৪২ লাখ সদস্য ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুত ছিল, এ ছাড়াও বর্তমান সরকার ১৭২ টি মুজিব কেল্লা, ৩৮৬৮ টি বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার নির্মান করেছে। জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য চলতি বছরে প্রায় ২৯০ কোটি টাকা খরচ করার কথা জানিয়েছে, মুজিব ক্লামেট প্রুস্পারিটি ইনিশিয়েটিভ এর আওতায় ৩০ মিলিয়ন বৃক্ষ রোপন সেই সাথে ৪০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানী উৎপাদনে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার এবং ডেল্টা প্লান ২১০০ প্রণয়ন করেছে যা জলবায়ু মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে। এ সকল কিছু তখনই সফল হবে যখন সাধারণ মানুষ তথা আমি আপনি সচেতন হবো, জলবায়ু সম্পর্কে জানবো, আমাদের তরুণ ও যুবাদের মধ্যে এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে পারবো। সরকারের উচিৎ জলবায়ু বিষয়ক প্রকল্প ও অন্যান্য কাজে সাধারণ মানুষের অন্তরভোক্তি নিশ্চিত করা, মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা সেইসাথে জলবায়ু তহবিল বৃদ্ধির জন্য কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, তাহলেই উপকুলবাসী মানুষের কান্না আর দক্ষিণা বাতাসের সাথে ভেসে আসবে না এবং পরিণত হবো উন্নত ও স্বয়ংসম্পূর্ন সোনার বাংলাদেশে।

মো: আরিফ ঊল্লাহ
উন্নয়নকর্মী,
কোস্ট ফাউন্ডেশন
Arif. Coast@gmail. Com

-Advertisement-
Recent  
Popular  

Our Facebook Page

-Advertisement-
-Advertisement-